Wednesday, 1 April 2020

লিংকটি খুলে ৭ পাতা খুলুন।

http://www.sukhabar.in/
নিভৃতপুরের গানওয়ালা রতন কাহার

রাধামাধব মণ্ডল

"বড়লোকের বিটি লো / লম্বা লম্বা চুল;
এমন মাথা বিন্ধে দিব / লাল গেন্দা ফুল৷"

নব্বই ছুঁই ছুঁই বয়সে আজও কাঁচা শীতের ভোরে মানুষটি হাঁটেন সিউড়ির পথে পথে। তিনি বাংলার প্রাচীন সাধন সংগীত টহলকে এখনও নিজের ভাষায় গান। জীবনের উপান্তে পৌঁছে মানুষটি হেমন্তের শীত কাতুরে ভোরবেলা গান গেয়ে ফেরেন ভাঙাচোরা গলায়। আজও এই অঞ্চলে তিনিই বাঁচিয়ে রেখেছেন বাংলার হারাতে বসা প্রভাতী সাধন সংগীত টহলকে। একক পথ পরিক্রমা করে তিনি পথে পথে এগান গেয়ে ফেরেন, শুধু জীবিকার টানেই নয়। এই টহল গানের মাধ্যমেই তাঁর খ্যাত এবং গলার রেওয়াজ করা।
"কালো কি ছুঁলে কালো হয়/ওহে রাই তোমারে শুধাই।/পদ্মপুষ্প হয় না  কালো, ভ্রমর বসে মধুখায়/ আমায় ছুঁলে হবে কালো জেনেছো কি রাই কিশোরী /শীঘ্র করে খুলে ফেল পরণের ওই নীল শাড়ি।"
বাংলার পথে পথে, রাঙা ধূলোয় খঞ্জনি বাজিয়ে কীর্তন করা এমাটির অতি প্রাচীন এক সংস্কৃতি। কার্তিকের শুরুর দিন থেকে সংক্রান্তি পর্যন্ত নগরের পথে পথে এগান আজও গাওয়া হয়। এই ধারা ধরে রেখেছেন বীরভূমের এই নগর কীর্তনীয়া। 
এই সাধন সংগীত নিয়ে বলতে গিয়ে স্মৃতিমেদুর শিল্পী বলে উঠেন, ‘ছোটবেলায় অন্ধ নেপাল দাসের কাছে টহলের কয়েকটা পদ শুনেছি। আজও সেই গাই ভোরবেলায়।"
তিনি নিজেও প্রভাতী সাধন সংগীত টহল গান বেঁধেছেন।
রতন গানওয়ালা প্রায় দু’হাজার গান লিখেছেন।
 সিউড়ি শহরের চার নম্বর ওয়ার্ডের নগরী গাঁয়ের লম্বা মাটির উঠোন! তারই মাঝখানে দোচালা মাটির ঘর! সেখানেই চাঁদপানা ছোট্ট মেয়েটার একঢাল চুলে লাল ফিতে দিয়ে খোঁপা বাঁধতে বাঁধতে নিজের ট্র্যাজিক জীবনের কাহিনি তরুণ লোকশিল্পীকে শুনিয়েছিলেন কুমারী মা। পতিতা মায়ের গল্প। তন্ময় হয়ে সে গল্প শুনছিলেন শিল্পী। পিতৃপরিচয়হীন নিজের একরত্তি মেয়েটা সম্পর্কে কথায় কথায় বলেছিলেন কুমারী মা, ‘এই যে এত্ত চাঁদ রূপ মেয়ের, হবে না-ই বা কেনে? জানিসই বড়লোকের বিটি আছে বটে’। মা চেনে বাবার পরিচয়! এই গল্প থেকেই জন্মায় কালজয়ী সেই গান, ‘বড়লোকের বিটি লো’। ১৯৭২ সাল সেটা, তারও আগে হতে পারে। সে দিনের সেই তরুণ শিল্পী রতন কাহার এখন অশীতিপর। তিনি এই গল্প শোনার পর বেঁধেছিলেন গান! বসিয়েছিলেন নিজের মতো করে মাটির সুর! রজত কুমার সাহার মাধ্যমে, রতন কাহারের থেকে খাতা নিয়ে তিনটি গান গাইবার জন্য নেন স্বপ্না চক্রবর্তী।
 ১৯৭৬ সালে গানটির রেকর্ডিং করেন স্বপ্না চক্রবর্তী৷ তারপর সেই গান অশোকা রেকর্ড কোম্পানির দৌলতে লোকের মুখে মুখে ফিরতে শুরু করে৷ জেতে গোল্ডেন ডিস্ক পুরস্কারও৷ এখনও একই রকম জনপ্রিয় গানটির স্রষ্টা রতন শুরুটা করেছিলেন আলকাপ দিয়ে। যাত্রার দলে ডাগরআঁখির ‘ছুকরি ’ সাজতেন৷ সং সাজতেন। তাতে দু'চার টাকা পেতেন। পরে তিনি নিজের উদ্যোগে তৈরি করেন ভাদু গানের দল৷ বেঁধেছেন অজস্র ঝুমুর গান৷ নেচে নেচে সে সব গেয়েছেনও। পুরস্কার, শংসাপত্র এত পেয়েছেন, যে একচিলতের ঘরে আর তা রাখার জায়গা নেই৷ এসব দিলে, মনে আনন্দও হয় না আর! এখন টাকা পেলে ছেলেদের হাত তুলে দেন, তাতেই বেজায় খুশি হয় গানওয়ালা রতন। সরস্বতীর বরপুত্রর লক্ষ্মীলাভ হওয়া সহজ কথা নয় কোনদিনই৷ এই গান ব্যস্ত মানুষটাই একদিন গান ছেড়ে দেওয়ার পথ ধরেন। চলে আসতে চান গানের পথ ছেড়ে! সাংসারিক তীব্র অনটনের কারণে এমনই স্থির করে জীবিকার প্রয়োজনে হাঁটতে শুরু করেন শ্রমের পথে! একসময় নিরন্তর দারিদ্রের সঙ্গে লড়তে লড়তে একেবারে বন্ধ হয়ে যায় গান বাঁধা৷ তবে কি তাতে মন টেকে? সেই সঙ্কট কাটিয়েও ওঠেন একসময় রতন কাহার! তবে এই গানপাগল মানুষটার খ্যাতি জোটেনি তেমন, তবে মানুষের মনের কুলঙ্গিতে ঠাঁই পেয়েছে তাঁর সুর৷ বীরভূমের প্রত্যন্ত গ্রাম
 বাসিন্দা মানুষটা বিড়ি বেঁধে, খেতে কাজ করে সংসার চালিয়েছেন৷ অভাব অনটন নিত্যসঙ্গী জীবনভর আর তাকে সঙ্গে নিয়েই মহানন্দে হেঁটে চলেছেন লালমাটির পথে।
তিন ছেলে এক মেয়ের কেউই মাধ্যমিকের গন্ডি টপকাতে পারেনি পয়সার অভাবে৷ মেয়েটা ভালো গান গায়, কিন্তু একটা হারমোনিয়ামও কিনে দিতে পারেনি অসহায় বাবা রতন কাহার৷ মেয়েও বাবাকে নিয়েছে নিজের মতো।
এখন আর বিড়ি বাঁধার ক্ষমতা তেমন নেই৷ গানওয়ালা পারে না অন্য কাজও করতে! এখন সম্বল সরকারি ভাতা এবং অনুষ্ঠান করে পাওয়া, ওই ক'টা টাকা! ভেঙেছে শরীরের দেওয়াল! কৃষ্ণ কালো মাটির উপর দাঁড়িয়ে দুই চোখের কিনারে চলকে ভেসে আসে এক উজ্জ্বল আলো! তাতেই গিয়েছেন নিজের নৌকায় বিস্মৃতির আড়ালে৷ কে আর কদর করে তাঁর!
     লোক সংগীতের রসিক লোক ছাড়া, আর সকলেই তাঁকে নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছে!
সেই কুমারী মা নিজের জীবনের সব গল্প বলেছিল রতনকে৷ ওঁর জীবনের আশ্রয়দাত্রী ছিল হরিদাসী৷ সেই প্রৌঢ়ার একটা ঝুমুরের দল ছিল৷ ওঁর কাছে থেকেই সুর নিতে গিয়ে তখনই আলাপ৷ সেই তরুণীর গল্পে এতটাই ডুবে গিয়েছিলেন, যে গানটা লেখার সময় ওই গল্পটাই মাথায় ঘুরছিল রতন কাহারের৷ ইশারায়-ইঙ্গিতে সেই মেয়েকে বাবুর বাগানে দেখা করতে বলত তার প্রেমিকটি৷ অল্প বয়সে না বুঝে সেই ফাঁদে পা দিয়ে ফেলে মেয়ে৷ যখন টের পায় শরীরে নতুন প্রাণের সঞ্চার ঘটেছে, তখন পিতৃত্ব অস্বীকার করে প্রেমিক৷ সে তো তথাকথিত বড় ঘরের৷ শুরু হয় জীবনের টানাপোড়েনের লড়াই। তাই তার ঔরসে জন্মানো নিষ্পাপ শিশুটিকে উদ্দেশ্য করেই তৈরি হয় "বড়লোকের বিটি লো" গানটি।
     একসময় চুটিয়ে কাজ করেছেন আকাশবাণীতে৷ পাহাড়ি সান্যালই তাঁকে নিয়ে গিয়েছিলেন ভালোবাসার  আকাশবাণীতে। সেই কলকাতার শহর চেবা! দূরদর্শনেও করেছেন নিয়মিত কাজ! দুই মাধ্যমেই নিয়মিত কাজ করেছেন তখন, একটানা বেশ কয়েক বছর। অভিমান জড়ানো গলায় বলেন, ‘আমাকে নিয়ে অনেকেই ব্যবসা করেছেন৷ আমার লেখা , আমার বাঁধা গান নিয়ে এসে রেকর্ড করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন৷ সবাই আশ্বাস দেন৷ কিন্তু কিছুই হয় না৷" আবার মুহূর্তেই অবশ্য অভিমান গায়েব হয়ে শিশুসুলভ সারল্য ঝরে পড়ে উনার কণ্ঠে, ‘ওঁরা আমাকে খুব ভালোবাসতেন৷ মলয় বিকাশ পাহাড়ি,  আর্য চৌধুরী, আনন গোষ্ঠীর রাজকুমার সাহারা নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন আমার সঙ্গে৷ আনন গোষ্ঠীর সঙ্গেই এসে খাতায় বড়লোকের বিটি লো গানটা লিখে নিয়ে গিয়েছিলেন স্বপ্না চক্রবর্তী৷ তবে তিনি রেকর্ড করার আগেই আমি গানটা গেয়েছিলাম রেডিয়োতে। 
পূর্ণচন্দ্র দাস বাউলও গেয়েছেন আমার গান, ভাঙা গলায় বললেন তিনি। তিনি আরও বললেন, আমার এই গান গুলি কিশোরী (দাশের) বাবুর "চন্দ্রভাগা" পত্রিকাতে ছাপা হয়েছিল। আরও বহু কাগজে হয়েছে ছাপা!
যাঁরা চিনেছেন -বুঝেছেন , তাঁরা কাজ দিয়েছেন রতন কে৷ তবে সময়ের দুর্বার স্রোতে ধীরে ধীরে কাজ কমতে শুরু করে রতনের জীবন থেকে৷ কেন্দ্রের পলিসিতে প্রসার ভারতী তার অনুষ্ঠানটা বন্ধ করে দেয় একসময়। পুরোনো মানুষ যাঁরা ছিলেন, তাঁরা অন্য জায়গায় চলে গেল বদলি হয়ে৷ আর তখন থেকেই রতন কাহারের জীবনে শুরু হয় আপাত অন্ধকারের ভাঁটা। থেমে যায় স্বাভাবিক ছন্দ। রতনের চিরকালের পছন্দের গান মাটির গান। আজও তাই ঝুমুর -ভাদুতেই ডুবে রয়েছেন তিনি৷ এখনও বাঁধছেন নতুন নতুন গান। নতুন প্রজন্ম খোঁজ নেয় না তেমন! তবে কেউ কেউ তাঁর কাছে আসেন আবেগ নিয়ে!
       শিলাজিতের জন্য ভাদু গান লিখেছিলেন তিনি৷ এই সময়ের জনপ্রিয় শিল্পী শিলাজিৎ হাজার তিনেক টাকা দিয়ে গিয়েছিলেন রতন কাহারের হাতে৷ তাতে বেশ খুশিই হয়েছিলেন। বিদ্যাসাগর কলেজে অনুষ্ঠান করে খুব প্রশংসা পান, সেই অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে রতনের কথা শুনেছিলেন শিল্পী কালিকাপ্রসাদ৷ ২০১৭ মার্চে শেষ বার সিউড়ির অনুষ্ঠানে আসার পথে, রতন কাহারের বাড়িতে আসারও কথা ছিল! কিন্তু সে সময় দুর্ঘটনায় পড়ে তিনি চলে যান৷ 
       রতন কাহার বেঁচে আছে গাঁয়ের মাটিতেই! এই ভাবনার মানুষের সংখ্যা বাড়লেও, রতন কাহার আজও মাটির গহীন অন্ধকার কোণে বসে বাঁধছেন নতুন নতুন গান। মাটি, মানুষের গান।
যে মানুষটা গান কে তার নিজের কন্যাসম মানতেন, গানের কথা সুর কাউকে নির্দ্বিধায় দিয়ে দিতেন, বদলে কেউ টাকা দিতে এলে বলতেন, "আমি বিটি বিচে টাকা লুবো না।" কেউ জানতেও চায় না আর সেই মানুষটার কথা...
       "আমার গান শুনে যান ওগো বাবু, সুখেরই সংসারে /আমি এখন শুখনো পাতা, কখন যাবো পরে। "

Thursday, 21 November 2019

Friday, 15 November 2019

Sunday, 25 August 2019

http://ekdin-epaper.com/epaper/edition/1145/kolkata-edition/1/xxx/page/15#

Friday, 23 August 2019

https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=447407445846221&id=321706221749678

Wednesday, 21 August 2019


কোলাজ সম্রাট তপন সাহা


 রাধামাধব মণ্ডলঃ কলকাতাঃ আজ তিনি একটি নাম। এবাংলায় তিনিই কোলাজ শিল্পের সম্রাট। তাঁকে নিয়ে একাধিক সংবাদ মাধ্যম আজ উদ্মাদনার তুফান তুলেছে। বার বার তাঁর নাম উঠেছে জাতীয় সম্মানের তালিকায়! তিনি শিল্পী হওয়ার নেশাতে হুগলী থেকে পালিয়ে এসে, একা একা দশ বছর কাটিয়ে গেছেন শান্তিনিকেতনে। তিনি শিল্পী তপন সাহা। তখন শান্তিনিকেতনের কলাপুকুর ডাঙায় তেমন বসতি গড়ে ওঠেনি। ধূ ধূ মাঠ। সেখানেই একটি মাটির বাড়িতে থেকে ঘুরে বেড়িয়ে শিখেছেন ভূঁইফোড় শিল্পীর প্রাথমিক শিল্পের পাঠ। পিতা যদুলাল সাহা। মা ননীবালা সাহার পাঁচ কন্যা ও তিন সন্তানের ছোট তপন সাহা। ১৯৬৪ সালের ২২শে এপ্রিল (বাংলা ৮ই বৈশাখ) হুগলি জেলার চুঁচুড়া শহরে তাঁর জন্ম। ছোট থেকেই জীবন যন্ত্রণার সঙ্গে লড়েছেন তপনবাবু। ছোট বেলায় শিল্পের প্রাথমিক পাঠ নিয়েছিলেন  সমর বন্দ্যোপাধ্যায় ও নীলয় ঘোষের কাছ থেকে। পরে কোলাজ নিয়ে, টেরাকোটার কাজ এবং কাটুম কুটুম তিনি নিজে নিজেই শিখেছেন। বৌদ্ধিক চেতনায় তিনি আজ কোলাজ সম্রাট। তিনি রং ছাড়া রঙিন ছবির কারিগর! সারা রাজ্যে তাঁর  একাধিক বার কোলাজ শিল্পের প্রদর্শনী হয়েছে। মূলীবাঁশের বেড়ার গোটা পাঁচেক ঘর,মাথার ওপরে পোড়ামাটির টালি,কাঁচামাটির মেঝে যেটি পরিচিত ছিল অরবিন্দ মাস্টরের স্কুল (গান্ধীকলোনী প্রাথমিক বিদ্যালয়)নামে পরিচিত। বছর সাড়ে তিনের একটি বাচ্চার বগলে একটি চটের বস্তা ,কাঠের ফ্রেমে বাঁধানো একটি কালো চকচকে শ্লেট আর একটি চক পেনসিল।বাড়ির গলি থেকে, হাত ধরে রাস্তা পার করে ছেড়ে দিলো, অজানা অচেনা এক মাষ্টারমশায়ের কাছে। পরের দিনও সেই হাত ধরা-ছাড়ার একই চিত্র। ততক্ষণে, চোখের জলে মাটি ভিজতে শুরু করেছে। উপায়-অন্তর না দেখে সেই বালকটির সাথেই, বাইরে অপেক্ষায় থাকতো তার মা,কখনো বা দুই দিদির কেউ একজন, দিনের পরদিন।কিন্তু কতদিনই বা সম্ভব। এভাবে সময়ের আয়েশ করার । সময়ের যে বড়ই টান। সাতজনের সংসারে ভীষন জরুরি ছিল দু’পেয়ে গরুর থেকেও চারপেয়ে গরুর বেশি দেখভাল করা। তা একদিন হয়েছে কি,সেই বালকটির মা কখন যে চুপিসাড়ে উঠে চলে এসেছে, তা টের পেতেই ছেলেটিও দে দৌড়। কিন্তু দে দৌড় দিলে কি হবে ? তার সেই ছোট্ট পায়ের সে দৌড় হাত বাড়িয়েই ধরে ফেললেন মাষ্টারমশাই ডাক্তার অরবিন্দ সাহা। আর ধরেই সপাটে পিঠের ওপর বসিয়ে দিলেন হাতের পাঁচ আঙ্গুলের দাগ।শব্দটা বেশ জোরেই হয়েছিলো। তারপর ঠিক কি হয়েছিলো আজ আর মনে পড়ে না শিল্পী তপন সাহার।স্কুলের ঘন্টা শেষ হলো। মাষ্টারমশায়ের বাড়িতে আসার খবর পেয়ে, পাশের বাড়ির কেরোসিন তেলের ড্রামের মধ্যে ঢুকে পড়েও রেহাই মিললো না তার। সেখান থেকেও তুলে নিয়ে এলো সেই মাষ্টারমশায়ই। পিঠের দাগে হাত বুলিয়ে আদর করে আঁকতে বসালো একটি কাপ প্লেট।পথ খুঁজে নেবার, উদ্বোধনের ফিতেটা কেটে দিয়ে শিল্পের আঁতুরঘরে একটা প্রদীপ জ্বালিয়ে দিলেন তিনি। তিনি আজ এবাংলার কোলাজ সম্রাট তপন সাহা।

Sunday, 18 August 2019

আজ সারাদিন বীরভূমের প্রাচীন ইতিহাসের গৌরবগাঁথা গ্রাম গুলির দু' একটি ঘুরতে ঘুরতে।
    যে গ্রামটি ঘুরে এসেছি সে গ্রামের ইতিহাস। বীরভূমে প্রকাশিত নয়াপ্রজন্মে।

লাল মাটির গ্রাম ঘুড়িষা, অতীত বীরভূমের বাণিজ্য নগর//     রাধামাধব মণ্ডল

বীরভূমের প্রাচীন গ্রাম ঘুড়িনগর আজ ঘুড়িষাগ্রাম। লোক ইতিহাসের আঁতুড় ঘর। প্রাগৈতিহাসিক যুগের যে ক'টি গ্রাম রয়েছে রাঢ় বাংলায়, তাদের মধ্য একটি গ্রাম বীরভূমের ইলামবাজার থানার ঘুড়িষা। সুদীর্ঘ সাড়ে তিন হাজার বছরের প্রাচীন প্রাগৈতিহাসিক যুগেও এ গ্রামের অস্তিত্ব ছিল। ১৯৭৫ খ্রীস্টাব্দে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগের অধিকর্তা পরেশনাথ দাশগুপ্ত প্রত্নতাত্ত্বিক সমীক্ষায় এসে তাম্রযুগের নিদর্শন উদ্ধার করেন। এবং প্রাচীন বসবসক্ষেত্রটি চিহ্নিত  করেন। প্রাচীন প্রস্তর যুগের যে গ্রামের অস্তিত্ব নানান কালপর্বের গৌরব অগৌরব গাঁথার মধ্য দিয়ে এগিয়ে এসেছে, আজও তার অস্তিত্ব গ্রামে গেলেই চোখে পড়ে।  গ্রামটির প্রাচীন নাম ছিল ঘুড়িনগর। এ তথ্য মেলে রায়পুরের জমিদার বাড়ি থেকে। তবে মধ্যযুগেও এগ্রাম ছিল স্বমহিমায় বিরাজমান একটি নদী কেন্দ্রিক সভ্যতার বাণিজ্য নগরী। মধ্যযুগের আগে এই গ্রামেরই নাম ছিল তিনোড়, পরবর্তী কালে শ্রীবৃদ্ধির কারণে গ্রাম নাম হয় শ্রীপুর। আরও পরে গ্রামনাম পাল্টেছে নানা সময়ে। ইছাপুর, শ্রীপুর, হরিহরপুর ও তিনোড় আজ অস্তিত্ব সঙ্কটে অবলুপ্তির পথে। যদিও আজও তিনটি মৌজা নাম হয়ে ইতিহাসের কালোস্রোতে ভাস্মর তিনোড়, ইছাপুর, শ্রীপুর।  এ গ্রামেই একদা রায়পুরের জমিদার সুভাষীনি দাসীর কাছে সুপরামর্শ নিয়ে "মুন্সীওয়ালা''রা সুজুনি কাঁথার ব্যবসা শুরু করেন। যা প্রাচীন অজাবতী, আজকের অজয় নদী পথ ধরে সুদূর কটদ্বীপ হয়ে বহিঃবঙ্গের নানা সীমাক্ষেত্রের উপর দিয়ে ওপাড় বাংলা ও অন্য মুলুকে পৌঁছে যেত সে কাঁথা। তবে সুজুনি কাঁথার পাশাপাশি, তাঁতিদের তাঁতঘরেরও রমরমা ছিল এ গ্রামটি। সেই সঙ্গে অতীত শিল্পের গ্রামীণ ধারাকে ধরে রেখে আজও শতাধিক পরিবার বন তাল ও খেজুর পাতার " তালাই'' শিল্প কে জীবন ও জীবিকা করে নিয়েছে।  নবাব আলীবর্দি খাঁ বর্ধমানের "রমনগড়ে'' অবস্থান কালে বর্তমান ঘুড়িষা গ্রামের ফকিরদের গান ও শীতলপাটি তালাই কিনে এনে মুগ্ধ হন। এবং রাজদরবারে ফিরে গিয়ে তিনি গ্রামীণ মহিলা এই শিল্পীদের তারিফ করেন।  এ গ্রামের কামরুননেশা বিবি শুধু তালাই বুনে শান্তিনিকেতনের কয়েক জন মানুষের  মাধ্যমে সুদূর লণ্ডনে ঘুরে আসেন।  গ্রামের (বর্তমান ) শ্রীপুর মৌজায় রাজা লক্ষণ সেন প্রতিষ্ঠিত " সায়েড়'' পুকুর এখনও রাজার নামে "লক্ষণ সায়েড়'' হিসাবে রয়েছে।  সেন রাজাদের যে একদা এঅঞ্চল মুক্তাঞ্চল ছিল তার প্রমাণ মেলে " সেনখা'' নামের পুকুরটি থেকে। সেনেদের খনন করা পুকুরটি থেকেই "সেনখা'' বা " সেনকা'' হয়েছে।  এটিও শ্রীপুর মৌজায় অবস্থিত একটি পুকুর। এছাড়াও গ্রামে এখনও রয়েছে "দেউল'' পুকুর।
মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্যের নানান ইতিহাসে মোড়া গ্রামটিতেই রয়েছে " বড়ো মঠের রঘুনাথে''র চার চালা নয়নশোভান মন্দির। মন্দির টি ১৬৩৩ খ্রীস্টাব্দে,  বাংলার ১৫৫৫ শকাব্দে নির্মিত হয়। গ্রামের প্রবীণ আব্দুস কামাল, আব্দুস সামাদরা জানান, ভাস্কর পণ্ডিতের নেতৃত্বে বর্গীরা এ মন্দিরের দেবতাকে হরণ করে নিয়ে যান। পরবর্তী কালে দীর্ঘ সময়কাল এমন্দির দেবতা শূন্য থাকার পর,  শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করা হয়। সুদৃশঢ় ও প্রাচীন কারুকাজে বোনা এই মন্দিরটি বীরভূমের গৌরবকে ধরে রেখেছি।  মন্দিরের খচিত লিপিতে উল্লেখ্য রয়েছে -
           রঘুওমাচার্য বিচিত্র মন্দিরম্
          রঘুত্তম প্রীতি সমৃদ্ধি বর্দ্ধনম্।
      হারাস্য কামাস্ত্র তিথি প্রবর্ত্তিতে,
শাকে বিনির্মিত; নমাম শিল্পীনা।।
  মন্দিরটি রঘুত্তম ভট্টাচার্য প্রতিষ্ঠা করেন। মন্দিরের উত্তর পূর্ব দিকের দুটি পথই অলঙ্কার সুদৃশ্য।  এবং দেব দেউলের পিছনের দিকে রয়েছে একটি ফলকে প্রতিষ্ঠা লিপি। দেউল গাত্রের অপূর্ব টেরাকোটা কাজে বোনা রয়েছে সে যুগের নানান পৌরাণিক কাহিনী। গ্রামে চলা পথে মেলে আরও একটি প্রাচীন মন্দির।  ১১৪৫ বঙ্গাব্দে ক্ষেত্রনাথ দত্ত প্রতিষ্ঠিত নবরত্ন মন্দির।  মন্দিরে রয়েছেন গোপাল ও লক্ষ্মী-জনার্দনে শিলা। ইতিহাসের এই গ্রামে পনেরো হাজারেরও বেশি জনসংখ্যার মানুষ বসবাস করছে। সম্প্রতিক অতীতেও এগ্রামের সংস্কৃতি,  জেলার হারানো গৌরবের মালাতেও স্বর্ণ উজ্জ্বল দ্রুতি ছড়িয়ে রেখেছিল। জেলার নাট্যইতিহাসের প্রাণপুরুষ শিশুরাম অধিকারীও এগ্রামে আসতেন, তার নাটকের চর্চা নিয়ে। অতীতের সেই ধারাবাহিকতা নিয়েই গ্রামের সুকান্ত, নজরুল,  নেতাজী ও বিবাদী ক্লাব গুলি নাট্যচর্চায় একদা জেলার গৌরব গাঁথাকে ধরে রেখেছিল। ২৫-৩০ ফকিরদের বসতি রয়েছে গ্রামে। তারা নিয়মিত দেহবাদী গানের চর্চা করেন। গ্রামের নূর মহম্মদ শা ফকিরি গান গেয়ে দেশ বিদেশে যাচ্ছেন নিয়মিত।  শুধু তাইনয় নূর মহম্মদ শা বাংলার এপ্রজন্মের একজন প্রতিষ্ঠিত গায়ক। গ্রামের রামতনু ভট্টাচার্য জানান, আমার জ্যাঠামশাই  রামচরন ভট্টাচার্য ছিলেন সে সময়ে গ্রামের মাথা। তাঁকে স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসাবে ভাতা দিত সরকার। ছোট বেলায় শুনেছি, আমাদের বাড়িতে বহু স্বদেশীদের আনাগোনা ছিল। বীরভূমের প্রাচীন টোল গুলির মধ্যে আমাদের বাড়ির টোলটিও ছিল।
বীরভূমের প্রাচীনতম এ গ্রামের নবরত্ন মন্দিরের অনুকরণই নাকি রাজা লক্ষণ সেন জয়দেবের মন্দিরা গ্রামে রাধামাধবের মন্দিরটি তৈরি হয়েছিল। অতীতের গ্রাম ছিল বাংলার ন্যায়, ব্রহ্ম, তর্ক শাস্ত্রের বিখ্যাত সব পণ্ডিতদের বসবাস ভূমি। বাংলার সে সময়কার সুবিখ্যাত পণ্ডিত রামময় পঞ্চতীর্থের সংস্কৃতের টোল ছিল এ গ্রামে। " মহামোহপাধ্যায়'' নামের এই সংস্কৃত চতুষ্পাঠী র খ্যাতি ছড়িয়ে ছিল, বাংলা মুলুকের বাইরেও। জানা যায় দেশ বিদেশের বহু ছাত্র এই চতুষ্পাঠী তে অধ্যায়ন করতে আসতেন। রামময় পঞ্চতীর্থের পিতা রামব্রহ্ম ন্যায়তীর্থ এই সংস্কৃত চতুষ্পাঠী স্থাপন করেন।
ঘুড়িষার পরিচিত প্রাচীন দেবী " হংসবাহিনী'',  ধীবরদের হাতে পূজিত হয়ে আসছে। দশহারাতে এখানে বার্ষিক পুজো হয় এবং মেলা বসে। গ্রামের তিনোড় মৌজায় " হাঁদা রামেশ্বর'' নামের একটি প্রাচীন শিব মূর্তি রয়েছে। চৈত্র সংক্রান্তির দিন এখানে বার্ষিক পুজো হয়। পানাগড় মোরগ্রাম (এন. এইচ- ৬০) জাতীয় সড়কের পাশ গ্রাম ঘুড়িষার অবস্থান। গ্রামের নোহনা বাঁধের ধারেই একদা ছিল ডাকাত রঘুর আস্তানা।  এ গ্রাম থেকেই ডাকাত সর্দার রঘু  আজকের দুবরাজপুর, অতীতের যুবরাজপুরে গিয়েছিলেন। সেখানে তাঁর প্রতিষ্ঠিত রঘুডাকাতের শ্মশানকালী এখনও রয়েছে। গ্রামের পরিচিত মুখ কামাল উদ্দিনের বাড়ির সামনেই রয়েছে একটি প্রাচীন বটগাছ। সেখানেই ধর্মদেবতার আটন। বুড়োরায় নামের ঐ ধর্মদেবতার থানেই অবহেলায় পরে রয়েছে জৈন তীর্থঙ্করের মূর্তি। কথিত আছে ধর্মতলার এই মাটির গুণে দেহের পুরোনো চর্মরোগ ভালো হত। আর এই মাঠের নাম ঘুড়ি বা কুড়িও বলেন কেউ কেউ। তা থেকেই গ্রাম নাম ঘুড়িষা হয়েছে ধরা হয়। কৃষি প্রধান বীরভূমের এই প্রাচীন লাল মাটির গ্রামকে নিয়ে জানার শেষ নেই।